বিবাহিত থেকেও কি একই সাথে স্বাধীন থাকা সম্ভব?
এটা কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয়। কেবল সামান্য একটু বোঝার প্রয়োজন। কয়েকটি মৌলিক সত্যকে মেনে নিতে হবে। প্রথমত, কেউ কারও জন্য জন্মায় না। দ্বিতীয়ত, অন্যকে কেমন হতে হবে—তোমার সেই আদর্শ বা প্রত্যাশা পূরণ করার জন্য কেউ এখানে আসেনি। তৃতীয়ত, তুমি নিজের ভালোবাসার মালিক এবং তুমি তা যতটা খুশি দিতে পারো—কিন্তু অন্য কারও কাছে ভালোবাসার দাবি করতে পারো না, কারণ কেউই কারও দাস নয়।
এই সাধারণ বিষয়গুলো যদি বোঝা যায়, তাহলে তুমি বিবাহিত নাকি অবিবাহিত—তাতে কিছু যায় আসে না; তোমরা একে অপরের সাথে থাকতে পারো—একে অপরকে নিজস্ব পরিসর বা ‘স্পেস’ দিয়ে এবং কখনোই একে অপরের ব্যক্তিত্বের উপরে হস্তক্ষেপ না করে। আসলে, বিবাহ একটি পুরনো অপ্রচলিত প্রথা। প্রথমত, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে জীবনযাপন করা ভালো নয়। যেকোনো প্রতিষ্ঠানই ধ্বংসাত্মক। বিবাহ লক্ষ লক্ষ মানুষের সুখের প্রায় সমস্ত সম্ভাবনাই ধ্বংস করে দিয়েছে—এবং এসবই ঘটেছে নিতান্তই অর্থহীন সব কারণে। আসলে বিবাহের সেই প্রথাটিই—ভিত্তিহীন বা অন্তঃসারশূন্য।
কোনো না কোনোভাবে প্রতিটি স্ত্রীই তার স্বামীকে ‘প্রহার’ করে। এটি হয়তো শারীরিক নয়, তবে মানসিকভাবে আঘাত করা অনেক বেশি বিপজ্জনক ও ক্ষতিকর।
তবে এর জন্য নারীকে দায়ী করা যাবে না; শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নারীকে নির্যাতন করা হয়েছে, হত্যা করা হয়েছে, পেটানো হয়েছে, জীবিত দাফন করা হয়েছে —আর এসব কিছুই তার অবচেতন মনে জমা হয়ে আছে। তার সবচেয়ে কাছের পুরুষটি হলো স্বামী, তাই সামান্য অজুহাত পেলেই সে ঝামেলা শুরু করে দেয়। স্বামীরা চায় না প্রতিবেশীরা এসব জানুক; আর স্ত্রীরা স্বামীর এই দুর্বলতা জানে, তাই চিৎকার-চেঁচামেচি বা জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলার মতো উপায়গুলো তারা কাজে লাগায়—যাতে পুরো পাড়া বিষয়টি জেনে যায়। তখন স্বামীকে অবিলম্বে আপস করতে হয়, কারণ এতে তার সামাজিক মর্যাদার প্রশ্ন জড়িয়ে থাকে।
তুমি জিজ্ঞেস করছ: " বিবাহিত থেকেও কি একই সাথে স্বাধীন থাকা সম্ভব?
বিবাহকে যদি তুমি খুব গুরুত্বের সাথে না নেও, তাহলে তুমি স্বাধীন থাকতে পারো। আর যদি একে গুরুত্বের সাথে নেও, তবে স্বাধীনতা অসম্ভব। বিবাহকে কেবল একটি খেলা হিসেবেই দেখো—কারণ এটি আসলে একটি খেলাই। বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখো—মনে রাখবে, জীবনের রঙ্গমঞ্চে এটি কেবলই একটি ভূমিকা যা তুমি পালন করছ; কিন্তু এটি এমন কিছু নয় যা অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ বা যার কোনো প্রকৃত বাস্তবতা আছে—এটি আসলে একটি কাল্পনিক বিষয়।
কিন্তু মানুষ এতটাই নির্বোধ যে তারা এমনকি কল্পকাহিনীকেও বাস্তব বলে মনে করতে শুরু করে। আমি মানুষকে চোখে জল নিয়ে কল্পকাহিনী পড়তে দেখেছি, কারণ সেই কাহিনীতে ঘটনাগুলো অত্যন্ত মর্মান্তিক। সিনেমার ক্ষেত্রে আলো নিভিয়ে রাখার বিষয়টি একটি চমৎকার কৌশল; এর ফলে সবাই সিনেমাটি উপভোগ করতে পারে—হাসতে, কাঁদতে, কিংবা দুঃখ বা আনন্দ অনুভব করতে পারে। আলো জ্বললে বিষয়টি কিছুটা কঠিন হতো—তখন হয়তো মনে হতো, ‘অন্যরা কী ভাববে?’ অথচ তারা খুব ভালো করেই জানে যে পর্দার ওপাশে আসলে কেউ নেই—সেখানে কোনো মানুষ নেই, এটা কেবলই প্রজেক্টরের মাধ্যমে দেখানো একটি ছবি। কিন্তু তারা সেই বাস্তবতার কথা পুরোপুরি ভুলে যায়।
আমাদের জীবনের ক্ষেত্রেও ঠিক একই ঘটনা ঘটেছে। অনেক বিষয় যা কেবল হালকাভাবে বা কৌতুকপূর্ণ দৃষ্টিতে দেখা উচিত, আমরা সেগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিই—আর সেই গুরুত্ব থেকেই আমাদের সমস্যার সূত্রপাত হয়।
প্রথমত, তুমি কেন বিয়ে করবে? তুমি কাউকে ভালোবাসো, কারো সাথে বসবাস করো— এটা তোমার মৌলিক অধিকারগুলোর অংশ। তুমি কারো সাথে থাকতে পারো, তুমি কাউকে ভালোবাসতেও পারো।
বিবাহ কোনো স্বর্গীয় ব্যাপার নয়; এটি এখানেই ঘটে—চতুর মোল্লা বা পুরোহিতদের মধ্যস্থতায়। তবে তুমি যদি সমাজের এই খেলায় শামিল হতে চাও এবং নিজেকে বিচ্ছিন্ন বা একা করে না রাখতে চাও, তাহলে তোমার স্ত্রী বা স্বামীকে বিষয়টি স্পষ্ট করে দাও যে, এই বিবাহ আসলে কেবলই একটি খেলা: "একে কখনোই খুব গুরুত্বের সাথে নিও না। বিয়ের আগেও আমি যেমন স্বাধীন ছিলাম, পরেও তেমনই থাকব; আর তুমিও বিয়ের আগের মতোই স্বাধীন থাকবে। আমি তোমার জীবনে কোনো হস্তক্ষেপ করব না, তুমিও আমার জীবনে কোনো হস্তক্ষেপ করবে না; আমরা দুজন বন্ধুর মতো একসাথে থাকব—আমাদের আনন্দ ও স্বাধীনতা ভাগ করে নেব, কিন্তু একে অপরের ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়াব না।"
"আর কোনো এক মুহূর্তে যদি আমাদের মনে হয় যে বসন্তকাল ফুরিয়ে গেছে, সেই মধুর শুরুর সময়টা আর নেই—তবে আমরা অভিনয় না করে একে অপরকে অকপটে বলব যে আমরা একে অপরকে গভীরভাবে ভালোবেসেছিলাম। আমরা চিরকাল একে অপরের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব; ভালোবাসার সেই দিনগুলো আমাদের স্মৃতিতে ও স্বপ্নে এক সোনালি অধ্যায় হয়ে ধরা দেবে—কিন্তু বসন্তকাল তো শেষ। আমাদের চলার পথ এমন এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে যেখানে—যদিও তা বেদনাদায়ক—আমাদের আলাদা হয়ে যেতেই হবে; কারণ এখন আর একসাথে থাকাটা ভালোবাসার পরিচায়ক নয়।"
"আমি যদি তোমাকে ভালোবাসি, তবে যেই মুহূর্তে দেখব আমার ভালোবাসা তোমার জন্য কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, ঠিক সেই মুহূর্তেই আমি তোমাকে ছেড়ে চলে যাব। আর তুমি যদি আমাকে ভালোবাসো, তবে যেই মুহূর্তে দেখবে তোমার ভালোবাসা আমার জন্য এক ধরণের বন্দিদশা তৈরি করছে, ঠিক সেই মুহূর্তেই তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে।" ভালোবাসা জীবনের সর্বোচ্চ মূল্যবোধ; একে কোনো অর্থহীন আচার-অনুষ্ঠানের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ করা উচিত নয়।
ভালোবাসা ও স্বাধীনতা একে অপরের পরিপূরক—তুমি একটিকে বেছে নিয়ে অন্যটিকে বাদ দিতে পারো না। যে স্বাধীনতার মর্ম বোঝে সে ভালোবাসায় পূর্ণ থাকে, আর যে ভালোবাসাকে জানে সে সর্বদা অন্যকে স্বাধীনতা দিতে প্রস্তুত থাকে। তুমি যাকে ভালোবাসো তাকেই যদি স্বাধীনতা দিতে না পারো, তবে আর কাকে দেবে? স্বাধীনতা দেওয়া মানেই হলো আস্থা রাখা। স্বাধীনতা হলো ভালোবাসারই এক বহিঃপ্রকাশ।
তাই তুমি বিবাহিত হও বা না হও, মনে রাখবে—সব বিয়েই আসলে কৃত্রিম; এগুলো কেবলই সামাজিক সুবিধামাত্র। বিয়ের উদ্দেশ্য তোমাকে বন্দী করা বা একে অপরের সাথে বেঁধে ফেলা নয়; বরং একে অপরের সাথে বেড়ে উঠতে সহায়তা করাই এর লক্ষ্য। কিন্তু বিকাশের জন্য প্রয়োজন স্বাধীনতা; অথচ অতীতের সব সংস্কৃতিই ভুলে গিয়েছিল যে, স্বাধীনতা ছাড়া ভালোবাসা মরে যায়।
আকাশে সূর্যের আলোয় ডানা মেলে উড়তে থাকা একটি পাখিকে দেখে তোমার খুব সুন্দর মনে হলো। তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তুমি পাখিটিকে ধরে একটি সোনার খাঁচায় রাখলে। তুমি কি মনে করো এটি সেই একই পাখি? বাহ্যিকভাবে, হ্যাঁ, এটি সেই একই পাখি যে আকাশে উড়ছিল; কিন্তু গভীরে এটি সেই একই পাখি নয় -- কারণ তার আকাশ কোথায়, তার স্বাধীনতা কোথায়?
এই সোনার খাঁচাটি তোমার কাছে হয়তো মূল্যবান; কিন্তু পাখির কাছে এর কোনো মূল্য নেই। পাখির কাছে মুক্ত আকাশে স্বাধীনভাবে বিচরণ করাই জীবনের একমাত্র মূল্যবান বিষয়। আর মানুষের ক্ষেত্রেও বিষয়টি ঠিক তেমনই।
Translation By রুদ্র মুহাম্মদ মনজু Respect By আপন দর্শন زيارتك
এত ভালোবাসা ও শান্তির সাথে আমার কথা গুলো পড়ার জন্য আমি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। পরিশেষে, আমি সকলের অন্তরের ঐশ্বরিক সত্তাকে ভক্তি জানাই। আমার অভিবাদন গ্রহণ করুন।

Comments