Skip to main content

"আদম: একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ" —লেখক : আল্লামা ছুফী ছৈয়দ জাফর ছাদেক শাহ্ (মা.) পীর ছাহেব, রাহে ভাণ্ডার সিলসিলা।


>>> আদম: একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ <<<

লেখক : আল্লামা ছুফি ছৈয়দ জাফর ছাদেক শাহ্ (মা.), পীর ছাহেব, রাহে ভাণ্ডার সিলসিলা। চট্টগ্রাম দরবার শরীফ, বোয়ালখালী, চট্টগ্রাম।

পবিত্র হাদিছ শরীফে বর্ণিত আছে, ‘আল্লাহতায়ালা তাঁর (আল্লাহর) নিজ অবয়বে আদম (আ.) তথা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন।’ আল্লাহ তায়ালার কোন নকশা বা ছুরত নেই। এই শিক্ষায় শিক্ষিত আদম সন্তান আমরা। তাই আল্লাহ সম্পর্কে পরিচিত হওয়ার কোন প্রকার অনুভূতি পরিলক্ষিত হয় না। আল্লাহর এই সুমহান বিশাল অস্তিত্বের প্রমাণ করা আমাদের সাধারণ জ্ঞানের আওতা বহির্ভূত। সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে চিন্তা করলে বুঝা যায়, আল্লাহ তায়ালা তথা স্রষ্টা নিজ ছুরত বা অবয়বে আদমকে সৃষ্টি করেছেন। নবীর (দ.) এই মহান বাণী অনুসরণ করতে আমাদের উচিত অসীম জ্ঞানের অধিকারী নবী মোহাম্মদুর রাসূলাল্লাহ (দ.) প্রদেয় ঐশী জ্ঞানে নায়েবে নবী তথা অলীআল্লাহগণের সংশ্রবে গিয়ে উক্ত জ্ঞান আহরণ করা অর্থাৎ পীর বা মুর্শিদের উছিলা তালাশ করা এবং ঐ জ্ঞানের আলোকে আগমন হয়ে মুক্তির সন্ধান করা। প্রসঙ্গত বলা যায়, আমি মানুষ আল্লাহরই সৃষ্টি। তিনি (আল্লাহ) আমার স্রষ্টা। তিনি নিজেই পবিত্র কোরআন শরীফে বলেছেন, ‘আমি তোমাদের গ্রীবাস্থীয় রগের চেয়েও নিকটে।

আল্লাহ যদি আমার এতই নিকটে, তাহলে তাঁকে আমি দেখলাম না চিনলাম না কেন? তাহলে স্পষ্টতই বুঝা যায় যে, কোরআন হাদিছ, ফেকাহ, বিজ্ঞান এত কিছু পড়ে শুনে এবং দেখেও আল্লাহর পরিচয় লাভ করার মত জ্ঞান নেই। সুতরাং আমার উচিৎ ঐ ব্যক্তির নিকট আত্মসমর্পণ করে তাঁর (মুর্শিদের) অনুসরণ, অনুকরণ, আদেশ নিষেধ মেনে চলা তথা মুর্শিদের এত্ত্বেবা করা। যিনি আল্লাহর সাথে বিশেষভাবে পরিচিত, যার কাছে আল্লাহর পরিচয়ও গোপন কিছু নয়।

এখানে উল্লেখ থাকে যে, বর্তমান যুগে মুর্শিদ নামের বেশভূষা দেখে অনেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এমনও অনেক ব্যক্তি আছেন তারা আরবি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে কিছু দোয়া তছবিহ শিখে এই শিক্ষাকে নিজের মতলবে ব্যবহার করে পীরগিরী ব্যবসা করছেন। উম্মতে মোহাম্মদী (দ.)’র প্রতি আমার পরামর্শ প্রথমে পীরকে পরীক্ষা করুন তারপর আপনার মনঃপুত হলেই তার এত্ত্বেবা করুন।

আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে আসল এবং নকল পীরের মধ্যে পার্থক্য কি? জবাবে উদাহরণ দিলাম। পীর সাহেব আপনাকে বললেন, ‘হে বৎস! তুমি পাঞ্জেগানা নামাজ পড়।’ কিন্তু আমি বলি, পীরের আদেশ মত তা করতে যাবেন না। কারণ নামাজ পীরের দেয়া ফরজ নয়। নামাজ আল্লাহরই ফরজ। প্রত্যেক মুসলমান, আকেল এবং বালেগ নর–নারীর উপর ফরজ। আপনি তা পালন অবশ্যই করবেন। আল্লাহর ফরজ হিসেবে, পীরের ফরজ হিসাবে নয়। নামাজের পর তছবিহ করতে বললে তা পালন করার যুক্তিই আমি দেখিনা। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, পীর সাহেব বললেন, ‘তুমি ফজরের নামাজের পর ১১১ (একশ এগার) বার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু জপনা করিও।’ উক্ত তছবিহ জপনার জন্য পীরের প্রয়োজন পড়ে না। মনে করেন পীর সাহেব আমাকে ১১১ (একশ এগার) বার তছবিহ জপতে বললেন, আমি ১১০০ (এক হাজার একশ) বার জপলাম। এই জপনার জন্য পীরের দরকার হয় না। যদি এ জপনা ও নামাজ শিখার জন্য পীরের দরকার হয়, তাহলে মাত্র ৫০ টাকার বিনিময়ে একটি মকসুদুল মো’মেনীন কিনলে,তব একট পীর কিনা গেল। অতি উত্তম পীর।

আপনার মনে আবারো প্রশ্ন জাগবে তাহলে পীরের নিকট থেকে কিইবা শিখতে হবে। জবাবে আমি নরাধম বলব, পীরের কাছ থেকে শিখার বিষয় হলো যা আমি দেখিনা তার দর্শন, যা আমি চিনি না তা চেনা, যা শুনিনা তা শ্রবণ করা, যার সাথে পরিচয় নেই তার সাথে পরিচিত হওয়া। অর্থাৎ নবী, আল্লাহ এবং ফেরেশতাগণসহ নানাবিধ অজানাকে জানা, অচেনাকে চেনা ইত্যাদি।

পবিত্র হাদিছ শরীফে বর্ণিত আছে, ‘মানুষ আমার রহস্য আমি তার (মানুষের) রহস্য’। তাহলে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, আমি কে? আল্লাহ কে? কোরআনের আলোকে একটু গভীরভাবে চিন্তা করুন আপনার সম্মুখে সন্ধানী জ্ঞানের আলো জ্বলে উঠবে। সে আলোকে আপনি আল্লাহর পথে অগ্রসর হতে পারবেন। পবিত্র কোরআন মজিদে বর্ণিত আছে যে, ‘আর যখন আপনার প্রভু, ফেরেশতাগণকে বললেন, নিশ্চয়ই দুনিয়াতে একজন খলিফা বা প্রতিনিধি বানাব’ ‘খলিফা (আদম) আল্লাহরই প্রতিনিধি। আদমের প্রতিনিধিত্ব অস্বীকারকারী অভিশপ্ত এবং সমালোচনাকারীর সমালোচনা অগ্রহণযোগ্য অর্থাৎ ফেরেশতাগণের সাধারণ জ্ঞান আদম সৃষ্টির (রহস্যজ্ঞানের) আওতা বহির্ভূত। এই জ্ঞান মালিক (আল্লাহ) এবং মালিকের প্রতিনিধির (আদমের) মধ্যে গুপ্ত এবং ব্যক্ত। আরো একটু ভাল করে জ্ঞান করলেই বুঝা যায়। ‘যখন আদম (আ.) সমস্ত জিনিসের নামসমূহ অনন্তর বলে দিলেন’। (ফালাম্মা আম্মাবাআহুম বে আছমাইহীম)। প্রমাণিত হল আল্লাহর প্রতিনিধি আদম (আ.) আল্লাহর শিক্ষায় শিক্ষিত এবং আল্লাহর জ্ঞানে জ্ঞানী। আল্লাহ তায়ালা তখনই ঘোষণা দিলেন, ‘আমি কি তোমাদের বলিনি? যে নিশ্চয়ই আমি জ্ঞাত আছি সমস্ত অদৃশ্য বিষয় আসমান এবং জমিনের। এবং আরও অবগত আছি যা তোমরা ব্যক্ত কর এবং যা অন্তরে গোপন কর তাও।’

হে মহান কোরআনের অনুসারীগণ! তবে চিন্তা করার বিষয় নয় কি? সমস্ত জিনিসের নামসমূহ আল্লাহ আদমের মারফতে সমস্ত গুপ্ত ব্যক্ত করার পরই আল্লাহ নিজেই দাবি করলেন, আমি আসমান জমিনে যা কিছু গুপ্ত সবকিছুই অবগত। তাহলে পরিষ্কারভাবে বুঝা যায়, যা মালিক অবগত তা মালিকের প্রতিনিধিও অবগত। ফেরেশতাগণের সামনে তা প্রমাণিত। প্রমাণিত হওয়ার পর ফেরেশতাগণকে আল্লাহ তায়ালার হুকুম-‘ওয়া ইজকুলনা লিল মালাইকাতিছ জুদু লি আদমা’ অর্থাৎ আর আমি (আল্লাহ) যখন ফেশেতাগণকে বললাম আদমের সামনে সিজদায় পতিত হও। তখন সকল ফেরেশতাগণ ছজিদা করলেন বা আদমের প্রতিনিধিত্ব নতশীরে মেনে নিলেন। শুধুমাত্র প্রতিনিধিত্ব অস্বীকারকারী ইবলিস ছাড়া। সে প্রতিনিধিত্ব অমান্য করলো, অহংকার করল এবং অভিশপ্ত হল। হে মানব (আদম) সন্তানগণ তুমিই কী সেই আদম? যে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে জমিনে এসেছ? তুমিই কী আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব কর? তুমিই কী সেই আদম যার আনুগত্য স্বীকার করে ছিলেন ফেরেশতাগণ!

সুতরাং আমি কে? আমার মূল কি? কোথায় ছিলাম? কোথায় এলাম? কি নিয়ে যাব? এই রহস্য জানার প্রয়োজন আছে। কোন প্রভাবে আমার অবস্থার পরিবর্তন? অর্থাৎ প্রকৃত আমি তথা আল্লাহর রহস্য আমিতে পরিবর্তন সাধন করা।

পরিশেষে বলি, ‘আপন নকশা’ তথা রাহে ভাণ্ডার এর প্রতিষ্ঠাতা ছাহেবুল অজুদুল কোরআন, আজাদ মোজাদ্দেদ এ জমান হযরত গাউছুল আজম শাহ ছুফী মৌলানা ছৈয়দ ছালেকুর রহমান শাহ (ক.) দুলহায়ে হযরত কেবলা কাবা, রাহে ভাণ্ডারী রাজনগরী এর দীক্ষায় দীক্ষিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। তিনি তাঁর মুরিদগণকে মূল্যবান জ্ঞান ‘খালাকাল্লাহু আদামা আলা ছুরাতীহি’ শিক্ষা দিয়েছেন এবং এই আলোকে সাধন ভজনের রাহ্‌ (রাস্তা) দিয়েছেন যা আইনুল এক্বীন (প্রত্যক্ষ ঈমান) পর্যায়ভুক্ত। উক্ত জ্ঞানের সন্ধানী তথা আপন নকশা সন্ধানী আদম সন্তানগণ খোদা প্রাপ্তির পথে আমার নবী করিম (দ.), গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী (ক.), দুলহায়ে হযরত রাহে ভাণ্ডারী (ক.) আল রাহে ভাণ্ডারীর আধ্যাত্মিক শক্তির প্রভাবে এবং আদর্শবাদের বদৌলতে সফল হোক। আমিন।

Comments

Popular posts from this blog

শাসকের ক্ষমতা বনাম সাধকের শক্তি | আনুশেহ আনাদিল | সুফিবাদ

কারবালার পর ক্ষমতা যখন ধর্মের ওপর দখল নিল, ইসলাম কিন্তু হারিয়ে যায়নি। রাজদরবার ছেড়ে চলে গিয়েছিল খলিফাদের প্রাসাদ, শাসকের গৌরব বাড়ানোর জন্য নির্মিত মার্বেলের মসজিদ, ক্ষমতাকে বৈধতা দেওয়া পোষা আলেমদের জগৎ থেকে দূরে। ইসলাম টিকে ছিল নীরবে– মরুভূমি পেরিয়ে, নদীর তীরে, বন-গ্রামে, সাধারণ মানুষের জীবনের ভেতরে। সাম্রাজ্য হিসেবে নয়, উপস্থিতি হিসেবে। কারবালা ছিল সভ্যতাগত ভাঙন। যখন ইয়াজিদ জুলুমের প্রতি আনুগত্য দাবি করল আর ইমাম হুসাইন (রা.) তা প্রত্যাখ্যান করলেন, তখন ইসলাম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছিল। ইমাম হুসাইনের (রা.) শাহাদাত শুধু রাজনৈতিক সহিংসতা নয়। এ ছিল সেই মুহূর্ত, যখন বিবেককে ক্ষমতার নামে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়েছিল। বাংলায় ইসলাম এসেছিল আউলিয়াদের মাধ্যমে। লোকজ ও আত্মিক স্মৃতিতে আছে, শতাব্দী ধরে প্রায় ৩৬০ জন আউলিয়া বাংলায় প্রবেশ করেছিলেন– সাধক, দরবেশ, চিকিৎসক, পথপ্রদর্শক। তারা ইসলামের বাণী বহন করেছিলেন শুধু আইনের আকারে নয়; জীবিত নৈতিকতা হিসেবে। তারা এ দেশের ভাষায় কথা বলেছেন। কৃষক, জেলে, তাঁতি আর দরিদ্র মানুষের পাশে বসেছেন। স্থানীয় সংস্কৃতি মুছে দেননি; রূপান্তরিত করেছেন। এই সুফিরা ভয...

HOLY URS-E HAYATI (URS MUBARAK) (RAHE VANDER SILSILA)

"মহান ওরছে হায়াতী | 07 কার্তিক ১৪৩২ ( বাংলা) | 23 অক্টোবর২০২৫" "HOLY URS-E HAYATI | 07 KARTIK 1432 ( Bangla Calendar ) | 23 OCTOBER 2025" The 64th Annual Holy URS-E HAYATI of Hazrat Shah Sufi Moulana SYED MOHAMMAD ABDUL MALEK SHAH (Q.S.A.)(1916-1980), will be observed at CHATTOGRAM DARBAR SHARIF in Chattogram, Bangladesh. RaheVander Silsila's GRAND SHAYKH Allama SUFI SYED JAFAR SADEK SHAH ( M. ) Al- Rahe Vanderi invited all of you to attend and achieve blessings on this holy occasion. Venue: CHATTOGRAM DARBAR SHARIF, CHITTAGONG, BANGLADESH. Date: October 23, 2025 (Kartik 7, 1432 Bangla Calendar) #UrsMubarak #UrsSharif #URSeHAYATI (খোশরোজ মোবারক) #RaheVander #রাহেভান্ডার #RaheBhander #Maizbhandar #ChattogramDarbarSharif #Chattogram #Chittagong #Bangladesh #Sufism #Islam Website: RaheVander .org ©️ Chattogram Darbar Sharif.

Three In One: প্রভু

Three In One: প্রভু :         -  নার্গিস আলমগীর অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি অপূর্ব তোমার সৃষ্টি যত দেখি জুরায়না আঁখি শুভ্র তুষারেরা বর্ষে যাচ্ছে। তোমার সূ...