Skip to main content

"কোরআনের আলোকে মানুষ সেজদা" —আল্লামা ছৈয়দ জাফর ছাদেক শাহ্ (মা.) পীর ছাহেব, রাহে ভাণ্ডার সিলসিলা।


কোরআনের আলোকে মানুষ সেজদা
আল্লামা ছৈয়দ জাফর ছাদেক শাহ (মা.)
পীর ছাহেব, রাহে ভান্ডার সিলসিলাহ

পবিত্র কুরআনুল কারিমে এ প্রসঙ্গে এরশাদ হচ্ছে, ‘এবং যখন আপনার প্রভু ফেরেশতাদের বললেন, আমি জমিনে আমার খলিফা সৃষ্টি করব।’
এখানে খলিফা সৃষ্টি দ্বারা বুঝায়, আল্লাহ জাল্লাশানুহু তাঁর পরিবর্তে জমিনে তাঁরই আদেশ–নির্দেশ, বিধি–বিধিান এবং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নিজ প্রতিনিধি সৃষ্টি করবেন।
‘তাঁরা (ফেরেশতাগণ) বলল, আপনি কি জমিনে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন যে তথায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে ও খুনাখুনি করবে?’
উল্লেখ্য, ফেরেশতাগণ আল্লাহ প্রদত্ত তস্‌বিহ, জিকির এবং কর্ম ছাড়া অন্য কিছু জ্ঞাত নয়। তাহলে আদমকে সৃষ্টি করার পূর্বে ফেরেশতাগণ কি করে জানলো যে আদম সন্তান দুনিয়াতে বিশৃঙ্খলা ও রক্তপাত করবে?
ফেরেশতাদের এই জ্ঞান আল্লাহ প্রদত্ত নয় বরং এই জ্ঞান তাদের ওস্তাদ (আযাযিল পরবর্তীতে শয়তান) এর দেওয়া শিক্ষা। যার সম্পর্কে অভিজ্ঞতা নাই তার বদনাম করা শয়তানী স্বভাব।
‘এবং আমরা আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করি।’ এই আয়াতাংশে ফেরেশতাকুল নিজেদের সুনাম জাহির করছে। এটাও শয়তানী শিক্ষা। পরের দুর্নাম এবং নিজের সুনাম দুটোই শয়তানী স্বভাব।
আল্লাহ জাল্লাহশানুহু জবাব দিলেন– ‘নিশ্চয় আমি যা জানি, তোমরা তা জানো না।’ ফেরেশতাগণকে তাদের ওস্তাদ আযাজিল আদম (আ.) এর তথা (মানবকুলের) ভালো কর্মগুলো সম্পর্কে অভিজ্ঞতা না দিয়ে মানবের খারাপ দিকগুলোর বর্ণনা শিক্ষা দিয়েছেন।
বর্তমান বিশ্বেও এমন কিছু আলেম নামধারী শয়তানের অনুসারী আছেন, যারা আল্লাহর প্রতিনিধি অলিউল্লাহগণের তরিকত ভিত্তিক কিছু কিছু শিক্ষা দীক্ষার সমালোচনা করে নিজেদেরকে শয়তানের শিষ্যের মত উপস্থাপন করেন। ফেরেশতাগণ যে আল্লাহর প্রতিনিধি সম্পর্কে অজ্ঞ আল্লাহ তা প্রমাণ করালেন। ‘আল্লাহ ছুবহানাহু তা’য়ালা আদম (আ.) কে সকল সৃষ্টির নাম শিক্ষা দিলেন, অত:পর যাবতীয় সবকিছু ফেরেশতাদের সামনে উপস্থাপন করলেন এবং বললেন, সকল বস্তুগুলোর নাম বলো যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক।’
আল্লাহ তাঁর প্রতিনিধি আদম (আ.) কে সৃষ্ট সকল বস্তু সম্পর্কে বস্তুর কার্যকারীতা, বৈশিষ্টাবলী, গুণাবলী, কর্মকৌশলাদি জ্ঞান–বিজ্ঞান এবং মৌলিক বিষয়াদি সকল শিক্ষা কুদরতীভাবে দান করেন এবং তাঁকে (আদম) আল্লাহর খলিফা নিযুক্ত করলেন।
তখন হতে আল্লাহতা’য়ালার পক্ষে পৃথিবীর সকল বিধি–বিধান বাস্তবায়ন করার দায়দায়িত্ব পরিচালনার ভারপ্রাপ্ত হন আদম (আ.)। ফেরেশতাদের প্রতি আল্লাহর নির্দেশ তোমাদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিতে হলে সকল বস্তুর নাম বলো, কিন্তু তারা সৃষ্টি জগতের কোন কিছু সম্পর্কে জ্ঞানের পরিচয় দিতে পারেনি।
আদমের উপর তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়নি। কারণ তারা জানে না যে আদম (আ.) আল্লাহতা’য়ালার প্রকৃত খলিফা।
‘তারা বললো, আমরা আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি যে, আপনি আমাদেরকে যা শিক্ষা দিয়েছেন তাছাড়া আমাদের কোন জ্ঞান নেই। নিশ্চয়ই আপনি মহাজ্ঞানী, মহা প্রজ্ঞাময়।’
‘তিনি এরশাদ করলেন, তুমি তাদেরকে (ফেরেশতাদের) বলো সকল বস্তুর নাম, যখন তিনি (আদম) বস্তু সমূহের নাম বলে দিলেন তখন আমার আল্লাহ এরশাদ করলেন, ‘আমি কি তোমাদেরকে বলিনি? আসমান–জমিনের অদৃশ্যাবলী আমি জানি। আর আমি জানি যা তোমরা প্রকাশ এবং গোপন করে থাক।’
আল্লাহতা’য়ালার হুকুমের সাথে সাথে আদম (আ.) সকল বস্তুর নাম প্রকাশ করলেন।
এখানে উল্লেখ্য, আদম আল্লাহর জ্ঞানে জ্ঞানী। ঐশী জ্ঞানে জ্ঞানী না হলে খোদায়ী খেলাফত পেতেন না। খলিফা হতে হলে তাঁকে খেলাফতের দায়িত্ববান হতে হবে। তাঁকে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বিচার সাম্যসহ আল্লাহ জাল্লাশানুহুর প্রদত্ত সকল ক্ষমতার প্রযোজ্য কর্মকাণ্ড পরিচালনা, সম্পাদনা এবং আল্লাহময় জগতের বিচরণ ক্ষমতা থাকতে হবে, অন্যথায় নয়।
ফেরেশতাদের ওস্তাদ আযাজিল (মুকাররাম) আদম সম্পর্কে যে শিক্ষা তাদের (ফেরাশতাদের) দিয়েছেন তা অসম্পূর্ণ জ্ঞান। জমিনের সকল কর্মকাণ্ডের নির্বাহক আল্লাহর প্রতিনিধি আদম; এই জ্ঞান তাদের দেওয়া হয় নাই।
মনে রাখতে হবে মানুষ যখন আল্লাহর খলিফা তখন তিনি সৃষ্ট বস্তুর নিগূঢ় রহস্য সম্পর্কে জ্ঞানী হয়। যেমন আদম (আ.) সব গূঢ় রহস্য ফেরেশতাদেরকে বর্ণনা করেছেন।
‘এবং যখন আমি ফেরেশতাদের হুকুম করলাম তোমরা আদমকে সিজদা কর, তখনই সবাই সিজদা করল। ইবলিশ ছাড়া। সে অমান্যকারী হল, অহংকার করল এবং কাফের হয়ে গেলো।’ (সূরা বাক্বারা, আয়াত ৩০/৩৪ দ্রষ্টব্য)।
আসলে অত্র সিজদা দ্বারা তারা আদমের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নেওয়ার সুযোগ পেল। তাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশিত হল।
ফেরেশতাদের পূর্ণতা প্রাপ্তির মাধ্যম হল হযরত আদম (আ.)। আদম (আ.) কে প্রদত্ত এই সিজদা নিয়ে অনেক মোফাচ্ছিরে কেরাম মতভেদ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, ফেরেশতাদের কেউ সিজদা করেছে কেউ করেনি।
সর্বাধিক বিশুদ্ধ মত হল, সমস্ত ফেরেশতাকে সিজদার নির্দেশ দিয়েছেন এবং সকলেই সিজদা করেছেন।
তাফসিরে খাজিন ও মাদারিকে উল্লেখ আছে, এটি সিজদায়ে তাহিয়্যা (সম্মানসূচক সিজদা)। সিজদায়ে এবাদত (এবাদতের সিজদা) নয়। তবে শুধু মাথা নিচু করে এ সিজদা করা হয়েছে তা নয় বরং মাটির উপর কপাল রেখেই এই সিজদা করা হয়েছে।
এই আয়াতে যারা ইবাদতের সিজদা হিসাবে বর্ণনা করেছেন তাঁরা বলেছেন, এই সিজদা আল্লাহকে করা হয়েছে এখানে আদম ক্বেবলামাত্র (মাসজুদ ইলাই) অর্থাৎ যার দিকে সিজদা করা হয়। আর আল্লাহ হলেন (মাসজুদ লাহু) অর্থাৎ যাঁকে লক্ষ্য করে সিজদা করা হয়।
এখানে কোন মোফাচ্ছিরের দ্বিমত থাকার কথা নয় যে, আদম (আ.) কে যেই সিজদা করা হয়েছে তা আদমকে করা হোক বা অদৃশ্য আল্লাহকে করা হোক; আদম (আ.) তথা মানুষকে সিজদা করার এই মতবাদের প্রবর্তক স্বয়ং আল্লাহ জাল্লাশানুহু।
উক্ত মতবাদের অস্বীকারকারী ইবলিশ শয়তান মোরতাদ, কাফের এবং লানাতুল্লাহ আলাইহি।
সুতরাং বিবেচ্য বিষয় এই যে, শয়তানের যে জ্ঞান–বিজ্ঞান আদম সিজদার বিপক্ষে এই মতবাদকে টিকিয়ে রাখার জন্য যারা উঠে পড়ে লেগেছে, তাদের বিদ্যা–বুদ্ধি, ধন–মন কি আল্লাহর পক্ষ অবলম্বন করছে? না শয়তানের পক্ষ অবলম্বন করছে। এই বিষয় তাদের উপর ন্যস্ত রইল। আল্লাহর প্রতিনিধি আদম (আ.) কে জ্ঞান দান ও ফেরেশতাদের অক্ষমতা সব কিছুর উদ্দেশ্য হলো আদমের শ্রেষ্ঠত্বের পক্ষে মত সৃষ্টি করা।
এখন কথা হল আদম সেজদার বিপক্ষে যারা বিদ্যা–বুদ্ধি, ধন–জন ও সাহায্য–সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন তারা কোন পক্ষ অবলম্বন করেছে? তারা কি আল্লাহর পথ, না শয়তানের পক্ষ অবলম্বন করেছেন? তা তারা নিজেরাই বিবেচনা করবেন।
আল্লাহ আমাদেরকে তাঁকে জানার, চিনার ও বুঝার তৌফিক দান করুন। আমিন।

প্রচারে-
ছৈয়দ মশিউর রহমান রাহাত
খাদেমুল ফোক্বরা, রাহে ভান্ডার

Comments

Popular posts from this blog

শাসকের ক্ষমতা বনাম সাধকের শক্তি | আনুশেহ আনাদিল | সুফিবাদ

কারবালার পর ক্ষমতা যখন ধর্মের ওপর দখল নিল, ইসলাম কিন্তু হারিয়ে যায়নি। রাজদরবার ছেড়ে চলে গিয়েছিল খলিফাদের প্রাসাদ, শাসকের গৌরব বাড়ানোর জন্য নির্মিত মার্বেলের মসজিদ, ক্ষমতাকে বৈধতা দেওয়া পোষা আলেমদের জগৎ থেকে দূরে। ইসলাম টিকে ছিল নীরবে– মরুভূমি পেরিয়ে, নদীর তীরে, বন-গ্রামে, সাধারণ মানুষের জীবনের ভেতরে। সাম্রাজ্য হিসেবে নয়, উপস্থিতি হিসেবে। কারবালা ছিল সভ্যতাগত ভাঙন। যখন ইয়াজিদ জুলুমের প্রতি আনুগত্য দাবি করল আর ইমাম হুসাইন (রা.) তা প্রত্যাখ্যান করলেন, তখন ইসলাম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছিল। ইমাম হুসাইনের (রা.) শাহাদাত শুধু রাজনৈতিক সহিংসতা নয়। এ ছিল সেই মুহূর্ত, যখন বিবেককে ক্ষমতার নামে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়েছিল। বাংলায় ইসলাম এসেছিল আউলিয়াদের মাধ্যমে। লোকজ ও আত্মিক স্মৃতিতে আছে, শতাব্দী ধরে প্রায় ৩৬০ জন আউলিয়া বাংলায় প্রবেশ করেছিলেন– সাধক, দরবেশ, চিকিৎসক, পথপ্রদর্শক। তারা ইসলামের বাণী বহন করেছিলেন শুধু আইনের আকারে নয়; জীবিত নৈতিকতা হিসেবে। তারা এ দেশের ভাষায় কথা বলেছেন। কৃষক, জেলে, তাঁতি আর দরিদ্র মানুষের পাশে বসেছেন। স্থানীয় সংস্কৃতি মুছে দেননি; রূপান্তরিত করেছেন। এই সুফিরা ভয...

HOLY URS-E HAYATI (URS MUBARAK) (RAHE VANDER SILSILA)

"মহান ওরছে হায়াতী | 07 কার্তিক ১৪৩২ ( বাংলা) | 23 অক্টোবর২০২৫" "HOLY URS-E HAYATI | 07 KARTIK 1432 ( Bangla Calendar ) | 23 OCTOBER 2025" The 64th Annual Holy URS-E HAYATI of Hazrat Shah Sufi Moulana SYED MOHAMMAD ABDUL MALEK SHAH (Q.S.A.)(1916-1980), will be observed at CHATTOGRAM DARBAR SHARIF in Chattogram, Bangladesh. RaheVander Silsila's GRAND SHAYKH Allama SUFI SYED JAFAR SADEK SHAH ( M. ) Al- Rahe Vanderi invited all of you to attend and achieve blessings on this holy occasion. Venue: CHATTOGRAM DARBAR SHARIF, CHITTAGONG, BANGLADESH. Date: October 23, 2025 (Kartik 7, 1432 Bangla Calendar) #UrsMubarak #UrsSharif #URSeHAYATI (খোশরোজ মোবারক) #RaheVander #রাহেভান্ডার #RaheBhander #Maizbhandar #ChattogramDarbarSharif #Chattogram #Chittagong #Bangladesh #Sufism #Islam Website: RaheVander .org ©️ Chattogram Darbar Sharif.

Three In One: প্রভু

Three In One: প্রভু :         -  নার্গিস আলমগীর অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি অপূর্ব তোমার সৃষ্টি যত দেখি জুরায়না আঁখি শুভ্র তুষারেরা বর্ষে যাচ্ছে। তোমার সূ...