রাহে ভান্ডার সিলসিলার মহান প্রতিষ্ঠাতা, দুলহায়ে হযরত, শাহ্ছুফি মওলানা ছৈয়দ ছালেকুর রহমান শাহ্ (ক.) রাহে ভান্ডারী’ এর সংক্ষিপ্ত জীবনী।
মাইজভান্ডারী চিরঞ্জীব বেলায়তী ধারার পূর্ণাঙ্গ উত্তরাধিকারী, হযরত গাউছুল আজম,শাহ্ছুফি মওলানা ছৈয়দ আহমদ উল্লাহ (ক.) মাইজভান্ডারী’র আদর্শের ধারক-বাহক, ছাহেবুল অজুদুল কোরআন, শাহ্ছুফি মওলানা ছৈয়দ ছালেকুর রহমান শাহ্ (ক.) রাহে ভান্ডারী হলেন, গাউছে মাইজভান্ডারীর অসংখ্য খলিফাগণের মধ্যে স্বীয় জ্যোতিতে ভূবন আলোকারী এক অনন্য নক্ষত্র। গাউছে মাইজভান্ডারী হযরত কেবলা (ক.) যাকে নিজে ‘দুলহা’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। তাঁর উক্ত স্নেহের দুলহাই একদিন সাধনার জগতে জ্ঞানের মঞ্চে সত্যিকারের দুলহা রূপে সিংহাসন অলংকিত করেছিলেন। যার ঘটনা বহুল জীবনী এ নূন্যতম পরিসরে প্রকাশ করা অসম্ভব। তথাপি কিয়দংশে বিষয়ের নিরিখে আলোকপাত করা বাঞ্চনীয়।
বংশ পরম্পরায় কোরাইশ গোত্রীয় আমাদের প্রাণপ্রিয় দুলহায়ে হযরত মওলানা ছৈয়দ ছালেকুর রহমান শাহ (ক.) ২০ অগ্রহায়ন ১২৫৩ বাংলা, ১৮৪৮ ইংরেজী, জন্ম গ্রহণ করেন এবং ৭ পৌষ ১৩৭৩ বাংলা, ২২ ডিসেম্বর ১৯৬৮ ইং, ০১ শাওয়াল, রবিবার ১২০ বছর বয়সে মহান রবের মিলনে বেছাল প্রাপ্ত হন।
তাঁর নামাজে জানাজা শরীফে ইমামতি করেন হযরত শাহ্ছুফি ছৈয়দ গোলামুর রহমান (কঃ) বাবা ভান্ডারী’র ছোট শাহেবজাদাগাউছে জামান, হযরত শাহছুফি মওলানা ছৈয়দ শফিউল বশর মাইজভান্ডারী (ক.)।
দুলহায়ে হযরত (ক.) ছিলেন মওলানা ছৈয়দ মোহাম্মদ লুৎফুর রহমান শাহ (রহ.) ও ছৈয়দা মাজুমা খাতুন (রহ.)’র সন্তান। তাঁকে বেশ কয়টি উপনামে স্মরণ করেন তার ভক্তগণ যথাঃ দুলহায়ে হযরত/ ছাহেবুল অজুদুল কোরআন/ ছাহেবুল অজুদে আকদছ্/ রাজে দুলহা/ রাহে ভান্ডারী/ রাজনগরী ইত্যাদি।
তাঁর দাদার নাম হযরত মৌলানা ছৈয়দ তৈয়বুল্লাহ শাহ (রহ.)। তিনি তাঁর পুরাতন বাড়ি: মুফতি বাড়ি, জাফদ নগর, বড় বিবির হাট, ফটিকছড়ি হতে মৌলভী বাড়ি, উত্তর রাঙ্গুনীয়ায় এসে বসতী স্থাপন করেন। যা পরবর্তীতে তাঁর আধ্যাত্মিকতার প্রভাবে রাহে ভান্ডার দরবার শরীফ নামে আশেককূলের হৃদয়ে স্থান করে নেয়।
কলিকাতা আলীয়া মাদ্রাসা হতে শিক্ষা সমাপনান্তে এক বিশেষ ঘটনার আবর্তে দেশে ফিরে গাউছুল আজম , শাহ্ছুফি হযরত মওলানা ছৈয়দ আহমদ উল্লাহ শাহ (ক.) মাইজভান্ডারীর ছোহবত বা সাক্ষাত প্রাপ্ত হন ছাহেবুল অজুদুল কোরআন হযরত মওলানা ছৈয়দ ছালেকুর রহমান শাহ (ক.)। এ প্রথম সাক্ষাত কালে হযরত কেবলা (ক.) তাঁকে ‘দুলহা’ সম্বোধন করেন এবং নিজ চাদর (শাল) পরিয়ে দেন। ঘটনার কিছুকাল পর তিনি তাঁকে এ বলে আদেশ দিলেন যে, ‘যাও দরিয়া কি উছ্পার গীর্জা কি ছামনে আদমীওঁকো মিঠাই খিলাও (অর্থঃ নদীর অপর পাড়ে গীর্জার সামনে জনসাধারণকে মিঠাই খাওয়াও)’।
নির্দেশ অনুধাবন করে তিনি প্রথম রওনা হন বোয়ালখালী থানার চরণদ্বীপ দরবার শরীফে। সেখানে দুলহায়ে হযরত (ক.) কে- সাদরে অভ্যর্থনা জানান তাঁর পীরভাই- উক্ত দরবারের প্রতিষ্ঠাতা হযরত মওলানা শেখ অছিয়র রহমান ফারুকী চরণদ্বীপি (কঃ)।
আপ্যায়নকালে অন্দর মহল থেকে তাঁর বিবির হাত হতে তিনি নিজে দুই গ্লাস বেলের শরবত নিয়ে আসছিলেন। এমন সময় তাঁর হাত হতে এক গ্লাস শরবত পরে যাওয়ায় তিনি আরেক গ্লাস আনতে যান।
এ ঘটনা দুলহায়ে হযরত (ক.)’র মনে দাগ কাটে। তিনি ভাবলেন নদীর (কর্ণফুলী) অপর পাড় হলেও তাঁকে এখানে পাঠানো হয়নি। ঘটনাটি বুঝতে পেরে বিন্দুমাত্র অপেক্ষা না করে তিনি এ বলে উক্ত স্থান ত্যাগ করেন যে, ‘এটি আমার জন্য যথার্থ স্থান নয়’। অতঃপর তিনি ইয়াঙ্গুন (বার্মা) গিয়ে হযরত কেবলা (ক.)’র খলিফা হিসেবে মানুষকে বায়াত বা দীক্ষাদানের কার্যক্রম শুরু করেন ১৮৯৫ সালে।
১৯৬১ সালে তিনি ইয়াঙ্গুনের হানতাওয়াড়ি, চিড়িয়ামে প্রথম দায়রা শরীফ স্থাপন করেন। উল্লেখ্য, উক্ত দরিয়া ‘নাফ’ নদী নামে আজ প্রতিয়মান। কেননা, নাফ নদী বাংলাদেশ ও মায়ানমারকে রাষ্ট্রীয় বিভক্তি সীমা দান করেছে।
ছাহেবুল অজুদুল কোরআন দুলহায়ে হযরত (ক.) গুরু কেন্দ্রিক কার্যক্রম বা সালাতের ক্ষেত্রে দেহ মাঝে বিরাজমান চিরন্তন অস্থিত্ব আল্লাহ- রাছুলের পরিচয় তথা কলেমায়ে তৌহিদের একাত্বতা অর্থাৎ ওয়াহাদাতুল অজুদ (গড়হড়ঃযবরংস)’র প্রত্যক্ষ দীক্ষা; কলেমা শাহদাতের আলোকে ব্যাপকভাবে উন্মোচিত করেন।
তিনি বলতেন, “কেবল তোমাকে (নিজেকে) চেনার জন্য আমার কাছে আসবে, অন্য কিছুর জন্য নয়।” এভাবে তিনি দেশ ও দেশের বাইরে অগনিত মানুষকে কলেমার প্রত্যক্ষ দীক্ষা বা বায়াত দান করেছেন।
তাঁর এ কার্যক্রম যুগোত্তর পরিচালনার জন্য তিনি বাংলাদেশ, মায়ানমার, ভারত ও বেলজিয়াম সহ পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বহু প্রতিনিধি নিযুক্ত করেন।
তাঁর প্রথমা বিবির নাম মরহুমা ছৈয়দা ছায়েরা খাতুন (রহ.) আর দ্বিতীয়া বিবির নাম মরহুমা কাজী নুর জাহান বেগম (রহ.)। তাঁর সন্তান সন্তুতিগণ হলেন যথাক্রমেঃ
১) মরহুমা শাহজাদী ছৈয়দা হাসনা আরা বেগম হাসিনা,
২) মরহুমা শাহজাদী ছৈয়দা জাহানারা বেগম
৩) মরহুম শাহজাদা ছৈয়দ মওলানা খাজা সুলতান মাহমুদ (খাজা মিয়া)
৪) শাহজাদী ছৈয়দা হোসনে আরা বেগম,
৫) মরহুমা শাহজাদী ছৈয়দা শওকত আরা বেগম,
৬) শাহজাদী ছৈয়দা ফারুক আরা বেগম,
৭) মরহুমা শাহজাদী ছৈয়দা ফাজিলাতুন্নেছা বেগম,
৮) শাহজাদী ছৈয়দা ফজিলত আরা বেগম,
৯) শাহজাদী ছৈয়দা ফোরকান আরা বেগম।
অন্যদিকে তাঁর হাজার হাজার মুরিদানের মধ্যে যারা খেলাফত প্রাপ্ত হয়ে খলিফা রূপে দিকে দিকে তাঁর আদর্শ ও দর্শনকে মানবের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছেন তাদের মধ্যে এ পর্যন্ত যাদের নাম জানা গেছে তারা হলেনঃ
১. শাহছুফি হাফেজ মওলানা হাশেম শাহ (ক.)- নবাবপুর, সোনাগাজী, ফেনী।
২. শাহছুফি হযরত মওলানা ছৈয়দ মোহাম্মদ আব্দুল মালেক শাহ (ক.)- কধুরখীল, বোয়ালখালী, চট্টগ্রাম।
৩. শাহছুফি হযরত মওলানা মোর্শেদ আলী কলন্দর শাহ (ক.)- হায়দ্রাবাদ, ভারত।
৪.শাহছুফি হযরত মওলানা গোলাম মওলা শাহ (ক.)- মায়ানমার।
৫. শাহছুফি হযরত মওলানা আবু বক্কর শাহ (ক.)- মায়ানমার।
৬. শাহছুফি হযরত মওলানা আরকানী শাহ (ক.)- কলিকাতা, ভারত।
৭. শাহছুফি হযরত মওলানা হাদী শাহ (ক.)- কলিকাতা, ভারত।
৮. শাহছুফি হযরত মওলানা আমিন শরীফ টেন্ডল শাহ (ক.)- বাথুয়া, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।
৯. শাহছুফি হযরত মওলানা দেলোয়ার হোসেন শাহ (ক.)- চরণদ্বীপ, বোয়ালখালী, চট্টগ্রাম।
১০. শাহছুফি হযরত মওলানা ইদ্রিস রাজা মিয়া শাহ (ক.)- পটিয়া, চট্টগ্রাম।
১১. শাহছুফি হযরত মওলানা ছিদ্দিক আহমদ ভূঁইয়া শাহ (ক.)- শিবপুর, ফাজিলপুর, ফেনী।
১২.শাহছুফি হযরত মওলানা ইছহাক শাহ (ক.)- ইছাখালী, মিরশ্বরাই, চট্টগ্রাম।
১৩. শাহছুফি হযরত মওলানা শেখ আব্দুল জলিল শাহ (ক.)- সুলতানপুর, রাউজান, চট্টগ্রাম।
১৪. শাহছুফি হযরত মওলানা রাজা মিয়া শাহ (ক.)- ছলিমপুর, সীতাকুন্ড, চট্টগ্রাম।
১৫. শাহছুফি হযরত মওলানা হাশেম শাহ (ক.)- মুম্বাই, ভারত।
১৬. শাহছুফি হযরত মওলানা দাউদ শাহ (ক.)- কলিকাতা, ভারত।
১৭. শাহছুফি হযরত মওলানা আব্দুল কাদের শাহ (ক.)- ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম।
১৮. শাহছুফি হযরত মওলানা ইউচুপ মমচা শাহ (ক.)- বেলজিয়াম।
১৯. শাহছুফি হযরত মওলানা আবু বক্কর শাহ (ক.)- ত্রিপুরা, ভারত।
(বিঃদ্রঃ চট্টগ্রাম দরবার শরীফের পক্ষ হতে বিভিন্ন সময়ে আমরা রাহে ভান্ডার দরবার শরীফ সংশ্লিষ্ট ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি হতে খলিফাগণের উল্লেখিত নাম প্রাপ্ত হলেও যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে এ তালিকা প্রকাশ করছি।)
রাহে ভান্ডার নামকরণটিও এখানে আলোচনার অপরিসীম গুরুত্ব রাখে। দুলহায়ে হযরত,ছাহেবুল অজুদুল কোরআন, মওলানা ছৈয়দ ছালেকুর রহমান শাহ (ক.) তাঁর দরবারকে নিজেই রাহে ভান্ডার নামকরণ করেন।
এখানে দেখা যায়, ‘রাহ’ অর্থ পথ বা রাস্তা, ‘এ’ অর্থ এর এবং ‘ভান্ডার’ অর্থ সমৃদ্ধ আধার বা স্থান বা উৎস’(জ্ঞানের উৎস বা ধনাগার)।
অতএব, শাব্দিক ও তাত্ত্বিক বিবেচনায় ‘রাহে ভান্ডার’ এর অর্থ দাড়ায়, ‘জ্ঞানের উৎসের পথ বা রাস্তা’।
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, এ দরবারের আলোচ্য বা আরাধ্য তথা চর্চার ও দীক্ষার বিষয় হল সে তত্ত্ব, যা মানব তথা সৃষ্টিকে স্বার্থক ‘মোহাম্মদ’ (দ.) রূপ তথা ‘নফসে মোতমাইন’ অর্থাৎ নিস্তরঙ্গ আমিত্ব লাভে ফানা-বাক্বা বা প্রভুর জাতে বিলয় প্রাপ্ত হয়ে অখন্ডে মিলন লাভে সফলকাম করে। আর এ কারনে নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, তাঁর এ নামকরণ পূর্ণ স্বার্থকতা পেয়েছে।
অন্যদিকে ‘মাইজভান্ডার’ বা ‘মধ্যের ভান্ডার’ নামকরণের যে সাধারন ধারনা প্রচলিত রয়েছে তার পাশাপাশি রাহে ভান্ডারী গবেষকগণ অনেকে মনে করেন, যে পূণ্যাত্মার জন্মের পূর্বেই ভবিষ্যৎ বাণী এসেছিল, তারই তত্ত্ব তথা গুরু গম্ভীর এ রাজ রহস্য চর্চা হবে বলে ঐশ্বরীক ভাবে প্রকৃতি পূর্ব হতে এখানে উক্ত জ্ঞান চর্চার পূণ্যভূমি হওয়ার বাসনায় এ নাম ধারন করে হযরত গাউছুল আজম মওলানা ছৈয়দ আহমদ উল্লাহ (ক.) মাইজভান্ডারী’র ধরায় শুভাগমনের অপেক্ষায় ছিল।
সার্বিক বিচারে প্রতিয়মান হয় যে, উল্লেখিত রাহে ভান্ডার দরবারে একই উদ্দেশ্যে কার্যক্রম পরিব্যপ্ত হয়েছে স্থানিক ও কালিক প্রভাব সিদ্ধ যুগোপযুগী কর্ম ও ভাব ধারায়। যা রাহে ভান্ডার দরবার শরীফে বর্তমান যুগে বাস্তবায়িত হচ্ছে বেলায়ত কাননে আজাদীর দীক্ষাগুরু- পাপতাপহারী, হযরত মওলানা ছৈয়দ মোহাম্মদ আব্দুল মালেক শাহ (ক.) রাহে ভান্ডারীর ৩য় পুত্র ও খলিফা হযরত শাহ্ছুফি আল্লামা ছৈয়দ জাফর ছাদেক শাহ্ (মা.) আল রাহে ভান্ডারী’র প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে চট্টগ্রাম দরবার শরীফে।
মূলত এতে ‘অজুদ’ তথা দেহতত্ত্বের দীক্ষা দানের মাধ্যমে প্রভুতত্ত্ব প্রকাশ করে অষ্টাঙ্গে সালাত তথা সর্বকর্মে ইবাদতের প্রত্যক্ষ শিক্ষা প্রদানই মূখ্য উদ্দেশ্য বলে একে ‘অজুদী তরীকা’ আর স্বকীয় বৈশিষ্টের সার্বিক বিচারে একে ‘রাহে ভান্ডার দর্শন’ নামে উল্লেখ করেছেন অত্র দর্শনের বর্তমান দীক্ষাগুরু।
এখানে উল্লেখ থাকে যে, দুলহায়ে হযরত (ক.)’র বেছাল পরবর্তী রাহে ভান্ডার দরবার শরীফের যাবতীয় কার্যক্রম সুষ্ট ভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে তার সন্তানগণ ও তাদের অনুজদের সমন্বয়ে স্বনামধন্য মূখ্য খলিফাগণ যে বলিষ্ট ভূমিকা পালন করেন এবং সে ধারায় আজো যে সকল আওলাদ ও খলিফাগণের প্রতিনিধিবৃন্দ নিরবিছিন্ন ভাবে মেধা ও শ্রম ব্যয় করে যাচ্ছেন, তাদের প্রত্যেকের অবদানকে আমরা নতুন প্রজন্ম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি।
(সংকলিত)।




No comments:
Post a Comment